ব্রেকিং আপ উইথ এডটেক ইজ হার্ড টু ডু: শিক্ষায় প্রযুক্তির মায়াজাল

ব্রেকিং আপ উইথ এডটেক ইজ হার্ড টু ডু: শিক্ষায় প্রযুক্তির মায়াজাল

শিক্ষা-প্রযুক্তি বা এডটেক (Edtech) আজ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এমন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যার উপস্থিতি ছাড়া আধুনিক শ্রেণীকক্ষের কথা ভাবাই যায় না। এক দশক আগেও এটি ছিল একটি “অতিরিক্ত সুবিধা”, কিন্তু এখন এটি প্রায় একটি বাধ্যতামূলক উপকরণ। তবে যেকোনো সম্পর্কের মতোই, এডটেকের সাথে আমাদের এই “প্রেমের” সম্পর্কেও রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জ, যা নিয়ে আলোচনা করা অত্যন্ত জরুরি।

কেন এডটেকের সাথে বিচ্ছেদ কঠিন?

এডটেকের সাথে আমাদের এই গভীর বন্ধনের মূল কারণগুলো বেশ শক্তিশালী:

  • ১. অ্যাক্সেসিবিলিটি (প্রাপ্যতা): এডটেক ভৌগোলিক বাধা ভেঙে দিয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও এখন বিশ্বের সেরা কোর্স এবং শিক্ষকের কাছে পৌঁছাতে পারছে। একটি স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেট সংযোগই যথেষ্ট।
  • ২. ব্যক্তিগতকরণ (Personalization): কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত প্ল্যাটফর্মগুলো প্রত্যেক শিক্ষার্থীর শেখার গতি, দুর্বলতা এবং আগ্রহ বুঝে কাস্টমাইজড শিখন পথ তৈরি করছে। এটি আর দশজনের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া নয়, বরং নিজের মতো করে শেখা।
  • ৩. কার্যকারিতা ও দক্ষতা (Efficiency and Engagement): ইন্টারেক্টিভ সিমুলেশন, গ্যামিফিকেশন এবং ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (VR) শিক্ষার বিষয়বস্তুকে আরও আকর্ষণীয় ও মনে রাখার মতো করে তোলে। বোরিং লেকচার এখন একটি মজার অভিজ্ঞতা।

কিন্তু এই সম্পর্কে ফাটল কোথায়?

“ব্রেকিং আপ ইজ হার্ড টু ডু” – এই উক্তিটি যেমন ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সত্য, তেমনি এডটেকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যখনই আমরা এডটেক থেকে দূরে সরে যেতে চাই, তখনই কিছু বড় সমস্যা সামনে এসে দাঁড়ায়:

ক. ডিজিটাল বৈষম্য (Digital Divide):

এডটেক যখন শিক্ষার মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়ায়, তখন যাদের ইন্টারনেট বা উপযুক্ত ডিভাইসের সামর্থ্য নেই, তারা আরও পিছিয়ে পড়ে। এটি বৈষম্য দূর করার বদলে নতুন করে “ডিজিটাল বৈষম্য” তৈরি করছে।

খ. ডেটা এবং প্রাইভেসি উদ্বেগ:

শিক্ষার্থীদের শেখার ধরন, গতি এবং ব্যক্তিগত তথ্য প্রতিনিয়ত এডটেক প্ল্যাটফর্মগুলিতে জমা হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ ডেটা কতটা সুরক্ষিত এবং এর বাণিজ্যিক ব্যবহার হচ্ছে কিনা—এই প্রশ্নটি প্রায়শই উদ্বেগের জন্ম দেয়।

গ. মানবিক সংযোগের অভাব:

শ্রেণীকক্ষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে মানবিক সংযোগ। প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার এই সংযোগকে দুর্বল করতে পারে। একজন স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা শিক্ষার্থীর মানসিক বা সামাজিক বিকাশে বাধা আসতে পারে।

এডটেকের ভবিষ্যৎ: ভারসাম্যই সমাধান

আমরা এডটেককে পুরোপুরি বর্জন করতে পারব না, আর তা করা উচিতও নয়। বরং আমাদের বুঝতে হবে যে, এডটেক হলো একটি সহায়ক টুল, এটি কখনো শিক্ষকের বিকল্প হতে পারে না।

ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস্থায় সফল হতে হলে আমাদের এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ মডেল তৈরি করতে হবে, যেখানে:

  1. শিক্ষক হলেন মধ্যমণি: প্রযুক্তির ব্যবহারের সিদ্ধান্ত শিক্ষকের হাতে থাকবে। এডটেক যেন শিক্ষকের কাজ কমিয়ে দেয়, প্রতিস্থাপন না করে।
  2. প্রযুক্তি মানবমুখী: যে প্রযুক্তিগুলো শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তা (Critical Thinking), সৃজনশীলতা এবং সামাজিক দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে, সেগুলোর ওপর জোর দিতে হবে।
  3. সচেতন ব্রেক: মাঝে মাঝে ডিজিটাল স্ক্রিন থেকে দূরে থাকার জন্য ‘টেক-ব্রেক’ বা বিরতি নেওয়া জরুরি। এটি শিক্ষার্থীদের মনোযোগ এবং মানসিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।

এডটেকের সাথে আমাদের সম্পর্ক হয়তো কখনোই শেষ হবে না, তবে এই সম্পর্ককে স্বাস্থ্যকর করে তুলতে হলে আমাদের প্রয়োজন সচেতনতা, উদ্দেশ্য এবং সর্বোপরি, মানবিকতার স্পর্শ। প্রযুক্তি যখন শুধুমাত্র শেখার প্রক্রিয়াকে সহজ করে, তখনই তা প্রকৃত অর্থে সফল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top